admin

প্রকাশিত: ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬

ভালোবাসার দায়ে ঘরছাড়া, পাগলী ও জন্মান্ধের ২৫ বছরের সংসার

ভালোবাসার দায়ে ঘরছাড়া, পাগলী ও জন্মান্ধের ২৫ বছরের সংসার

স্টাফ রিপোর্টার:

বাসমতিকে এলাকার মানুষ পাগলী বলে ডাকে। আর তিনি এক অন্ধ ব্যক্তির সাথে প্রেমে জড়িয়ে যান। তাই বাসমতিকে তার পরিবারের সম্মানের ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। একইভাবে অন্ধ ব্যক্তিকেও শুধু পাগল নারীর সাথে প্রেমের সম্পকের কারনে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।অন্যদিকে তাদের কেউ কাজও দেয়না। কোন উপায় না পেয়ে গ্রামের পাশেই এক বাজারে থাকতে শুরু করলেন ছাপরি বানিয়ে। তখনই তিনি দিন শুরু করতেন ভোরবেলায়, তার স্বামীকে সাহায্য করার মাধ্যমে। কারণ স্বামী জন্মান্ধ। নাস্তা তৈরি থেকে শুরু করে তাকে স্নান করানো এবং পোশাক পরা – সবকিছুই তার দায়িত্ব।

তারপর তার হাত ধরে ভিক্ষা করতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। গত ২৫ বছর ধরে, ৪৫ বছর বয়সী বাসমতি রবিদাসের জীবন তার স্বামী রামনারায়ন রবিদাস। তাদের গল্প কেবল শারীরিক অক্ষমতার সাথে লড়াই করার জন্য নয়; তাদের গল্প সংগ্রাম এবং প্রতিকূলতার দ্বারা পরীক্ষিত প্রেমের গল্প।

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পালকিছড়া চা বাগানে দম্পতির ছোট টিনের ঘরে পরিদর্শনের সময়, দম্পতিকে একসাথে হাত ধরে হাটতে দেখা যায়। রামনারায়ন প্রথম বিয়ে করেছিলেন কিন্তু সেই স্ত্রী মারা যায় সন্তান প্রসবের সময় সেটা প্রায় ৩০ বছর আগে। তারপর তিনি ছন্নছাড়া হয়ে পড়েন। পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ তাকে আর গুরুত্ব দিতো না।

তারপর দেখা হয়ে যায় বাসমতির সাথে। চা বাগানের রাস্তায় কথা হতো একজনের সাথে আরেকজনের। চা বাগানের সেকশনেই শুরু হয় ভালোবাসার গল্প। সেই থেকে প্রেম। বাসমতি বলেন, তার সাথে দেখা হলে মন ভরে কথা বলতাম। কিন্তু আমার পরিবার কেউ তাকে সহ্য করতো না। সবাই আমাকে পাগল বলতো। তার সাথে সম্পর্কটা কেউ মেনে নিতে পারেনি। একদিন আমাকে তারা ঘর থেকেই বের করে দিলো। আমিও উপায় না পেয়ে তার ঘরে আশ্রয় নেয়। কিন্তু আমার স্বামীর বাবা আমাকে গ্রহন করলেন না। আমার কারণে তাকেও বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হলো।

তারপর থেকেই আমরা একে অন্যের হাত ধরে রাস্তায় থাকতে শুরু করলাম। সারাদিন একসাথেই থাকতাম। ভিক্ষা করতাম। আমার স্বামীর আত্মীয় স্বজনরাতো আমাদের দেখলে থুথু দিতো। কারণ আমি অন্ধ ব্যক্তিকে বিয়ে করেছি। তাই আমার বোনের সংসার টিকবে না এই দোহায় দিয়ে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়।

আমাদের নিজের জাতের মানুষজন আমাদের এতো অবমুল্যান করতো যে দেখে বড় কষ্ট লাগতো। প্রায় পাচমাস বাজারের গাছের নিচে থাকলাম। ভিক্ষায় যে কাপড় চোপড় পেতাম তাই দিয়ে কোনমতে দিনকাল পার করতাম। তারপর এক লোক দয়া করে তার বারান্দায় থাকতে দেয়। সেই সময় প্রতিদিন যেতো শুধু কান্নাকাটি করে। শুধু ভগবানকে বলতাম এতো কষ্ট কেনো দিলে ভগবান তুমি।

তিনি বলেন, আমার স্বামী অন্ধ দেখতে পায় না ঠিকই। কিন্তু সে আমার সঙ্গ কোনদিন ছাড়ে নি। আমার কথা সে শুনে সবসময়। আমাকে সবাই পাগলি বলতো। অথচ কেউ আমারও কথা শুনে সেই ঘটনাটা আমাকে অবাক করতো। তখন একটা কথায় মনে হতো আমার মতো পাগলের কথা কেউ না শুনলেও একজনতো শুনে।

এদিকে রামনারায়ণ বললেন, আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়ি। কেউ আমার খেয়াল করতো না। তখনই দেখা হতো বাসমতির সাথে। মন খুলে কথা বলতাম। তার সাথে সম্পকের কথা জানাজানি হলে আমার বাবা বললেন তোমার জনমের ভাগী আমি হলেও কর্মের ভাগীতো আমি হতে পারবো না। বলে আমার বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। উপায় না পেয়ে বাড়ি ছেড়ে গেলাম।

তিনি বলেন, বাসমতি যখন দেখা করতে আসতো। খুব অবাক হতাম। আর শুধু ভাবতাম। আমার মতো অন্ধ যার ঠাই নেই পরিবারেই তাকে আবার কেউ ভালোবাসে। সেই থেকে তার কথা শুনতে লাগলাম। তার প্রতি আসক্ত হতে শুরু করলাম। তার প্রতি কৃতঞ্জতা জন্মাতে শুরু করলো।

রামনারায়ণ’র জীবনে তার স্ত্রীর ভূমিকার কথা বলতে বলতে তার চোখ জলে ভরে ওঠে। তার কাঁধে হাত রেখেই আমাকে চলতে হয়, তার চোখেই আমার ভরসা, তিনি বলেন। যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তিনি কি কখনও তার স্ত্রীর জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়েছেন, তখন তিনি বলেন, আমি কেবল তার পাশে ছিলাম। সে আমাকে জীবনের বাকি সবকিছু দিয়েছে।

তিনি বলেন, আমার আর এমন মনে হচ্ছে না যে আমি আর সংগ্রাম করছি। আমি যা করতে চাই তা হল আমার বাকি জীবন এই মানুষটির যত্ন নেওয়া। বাসমতি বলেন, একবছর হতে না হতেই এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয় আমাদের পরিবারে। তখন আমাদের মধ্যে এক আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু তার ভরন পোষন নিয়ে চিন্তায় আমরা ঘুমাতে পারতাম না।

তিনি বলেন, খাবার অভাবে অনেক সময় আমার বুকে দুধ হতো না। প্রতিবেশীরা এসে দুধ খাওয়ে দিতেন। প্রায় দিন হতো আমাদের সন্তান উপোষ ঘুমাতো। কারণ ভিক্ষা করে আসতে আসতে রাত হয়ে যেতো। সন্তান উপোষ ঘুমিয়ে যেতো। তারপর আমাদের আরেক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তারপর আমরা আস্থা পেতে থাকি।

সন্তান নিয়ে ভিক্ষা করা দেখলে সমসেরনগর বাজারের অনেকে বলতো সন্তানকে রোদ লাগাইনে না। এই কথা বলে তারা তিনচারজন মিলে একদিনে খোরাক দিয়ে দিতো। তখন মনে হতো এখনো ভালো মানুষ আছে। চোখে না দেখলেও জীবনের নিষ্ঠুরতা তিনি হাড়ে হাড়ে দেখেছেন। টিনের চালার নিচে চারজনের পরিবার নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের যুদ্ধ শুধু বেঁচে থাকার। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভিক্ষা করে কোনো রকমে দিন পার করতেন। তবু মনের ভেতরে ছিল একটুখানি স্বপ্ন—এই জীবন বদলাবেন, ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখবেন চিরতরে।

অনেক কষ্টে, অনেক লজ্জা আর অনিশ্চয়তা সয়ে তিনি নিলেন এক লাখ টাকার ঋণ। ঘরের জমানো শেষ সম্বল যোগ করে কিনলেন একটি অটোরিকশা। ভেবেছিলেন, ছেলে সেটি চালাবে, ঘরে দু’মুঠো ভাত নিশ্চিত হবে, ভিক্ষার জীবনের অবসান হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাঁচলো মাত্র ছয় মাস।

গত ৩১শে ডিসেম্বর ভোরে ঘুম ভাঙতেই রামনারায়নের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার—যেন জন্মান্ধতার চেয়েও ভয়ংকর। উঠোনে এসে দেখেন তালা ভাঙা, ভেতরে অটোরিকশা নেই। সব শেষ। যে বাহনটি ছিল বেঁচে থাকার শেষ ভরসা, সেটিও চোরের হাতে হারিয়ে গেল।

উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় রামনারায়ন বলেন, বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করেই সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে রিক্সাটা কিনছিলাম। ভাবছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে চালাবে, সংসার চলবে। কিন্তু ভগবান আর সে সুখ দিলেন না। এই কথাটুকু বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাস শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, এই অটোরিক্সাটাই আছিল বিপদের ভরসা।

মনে করছিলাম, আর ভিক্ষা করবো না। সংসারটা একটু দাঁড়াইবো। সব শেষ হয়ে গেল। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল। রামনারায়নের কণ্ঠে আছে ক্ষোভের চেয়ে বেশি হতাশা।

স্বামীর প্রতি বাসমতির ভক্তি দেখে দম্পতির প্রতিবেশীরা বিস্মিত। সমস্ত বিস্ময় এবং গৌরব দেখে বিচলিত না হয়ে, বাসমতি দীর্ঘদিন ধরে এই সংগ্রামের সাথে শান্তি স্থাপন করেছেন।

সুমন যাদব নামে একজন প্রতিবেশী বলেন, এতো অভাব, অপমান, দুঃখ কষ্ট, লাঞ্চনা তবু শুধু ভালোবাসার জন্য একটি সংসার টিকে আছে ২৫ বছরের উপরে। একজন স্ত্রীর ভালোবাসা, নিষ্ঠা এবং দায়িত্ব কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা বিশ্বাস করা কঠিন, যদি না আপনি বাসমতিকে দেখেন।


সর্বশেষ সংবাদ

সিসিক প্রশাসকের সঙ্গে কসোভোর রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বের প্রতিশ্রুতি

সিসিক প্রশাসকের সঙ্গে কসোভোর রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বের প্রতিশ্রুতি

স্টাফ রিপোর্টার: ঢাকায় নিযুক্ত কসোভো প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূত লুলজিম প্লানা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে

দক্ষিণ সুরমায় বিসমিল্লাহ্ কম্পিউটার কেন্দ্রের ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও পুরস্কার বিতরণ

দক্ষিণ সুরমায় বিসমিল্লাহ্ কম্পিউটার কেন্দ্রের ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও পুরস্কার বিতরণ

সিলেটের প্রবেশদ্বার দক্ষিণ সুরমায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রত্যয়দীপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘বিসমিল্লাহ্ কম্পিউটার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে এসএসসি ও দাখিল

সিলেটের ২৪৫ পশুর হাটের নিরাপত্তা দেবে র‌্যাব

সিলেটের ২৪৫ পশুর হাটের নিরাপত্তা দেবে র‌্যাব

স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সিলেট বিভাগের চার জেলা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিশেষ নিরাপত্তা দেবে র‌্যাব-৯। নির্ধারিত এলাকায়

বন্দরবাজারে আধুনিক ট্রাফিক পুলিশ বক্সের উদ্বোধন করলেন এসএমপি কমিশনার

বন্দরবাজারে আধুনিক ট্রাফিক পুলিশ বক্সের উদ্বোধন করলেন এসএমপি কমিশনার

স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাজের পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্যে বন্দরবাজারে নবনির্মিত আধুনিক ট্রাফিক

ঈদের দিন সিসিকের যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন

ঈদের দিন সিসিকের যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন

স্টাফ রিপোর্টার: আগামী বৃহস্পতিবার কুরবানির ঈদ অর্থাৎ- পবিত্র ঈদ উল আজহা। এদিন কুরবানির পশুর বর্জ্য পরিস্কার করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে

খন্দকার মুক্তাদিরের প্রচেষ্টায় সিলেট-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চালু হচ্ছে ফ্লাইট

খন্দকার মুক্তাদিরের প্রচেষ্টায় সিলেট-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চালু হচ্ছে ফ্লাইট

স্টাফ রিপোর্টার: বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এবং সিলেট-১ আসনের এমপি খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রচেষ্টায় সিলেট-চট্টগ্রাম ও সিলেট-কক্সবাজার রুটে চালু

এক সপ্তাহের দায়িত্ব” দাবি নিয়ে নতুন প্রশ্ন টাকা আদায়ের অভিযোগে সামছুজ্জামান সামছুকে ঘিরে ক্ষোভ আরও তীব্র

এক সপ্তাহের দায়িত্ব” দাবি নিয়ে নতুন প্রশ্ন টাকা আদায়ের অভিযোগে সামছুজ্জামান সামছুকে ঘিরে ক্ষোভ আরও তীব্র

আহমেদ শাকিল : সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে অর্থ বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাকরি টিকিয়ে

সিলেটে হাম উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু

সিলেটে হাম উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার: সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়