admin

প্রকাশিত: 6:01 PM, September 12, 2026

বাণিজ্যিক শোষণে টাঙ্গুয়ার হাওর বিপন্ন পরিবেশের হুমকি

বাণিজ্যিক শোষণে টাঙ্গুয়ার হাওর বিপন্ন পরিবেশের হুমকি
  • পর্যটনের নামে বাড়ছে নৌযান, শব্দ ও বর্জ্য; সংকটে জীববৈচিত্র্য

আব্দুর রহমান:

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার টাঙ্গুয়ার হাওর। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, নীল আকাশ, চারপাশের পাহাড় আর জলজ উদ্ভিদের সমারোহে এই হাওর হয়ে ওঠে অনন্য এক প্রাকৃতিক ভূখণ্ড। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। আর সেই আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বড় ধরনের পর্যটন ব্যবসা। কিন্তু পরিকল্পনাহীন ও বাণিজ্যিক পর্যটনের চাপে এখন হুমকির মুখে পড়েছে টাঙ্গুয়ার হাওরের নাজুক প্রতিবেশব্যবস্থা।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমিতে পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের আনাগোনা। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য উচ্চ শব্দে গান বাজানো, জেনারেটর ব্যবহার, প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্য ফেলা এবং নির্বিচারে নৌযান চলাচলের মতো কর্মকাণ্ড হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব কর্মকাণ্ডের কারণে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।
একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকের উপস্থিতি ছিল সীমিত। স্থানীয় নৌকা ও স্বল্প পরিসরের পর্যটন কর্মকাণ্ডের মধ্যেই ভ্রমণ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে হাউসবোটকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।

একটি হাউসবোটে একসঙ্গে অনেক পর্যটক অবস্থান করেন। রান্নাবান্না, জেনারেটর চালানো, পানির ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয় বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে এসব বর্জ্য শেষ পর্যন্ত হাওরের পানিতেই গিয়ে পড়ে।

শুধু বর্জ্য নয়, নৌযানের ইঞ্জিনের শব্দ ও পর্যটকদের উচ্চ শব্দও জলচর পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে প্রজনন ও বিচরণ মৌসুমে অতিরিক্ত মানবিক উপস্থিতি হাওরের পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থলের ওপর চাপ তৈরি করে।

টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএর ভেতরে অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ বিদদের উদ্বেগের কারণ। হাওরের বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটক ও নৌযানের অবাধ প্রবেশের ফলে জলজ উদ্ভিদ, মাছ ও পাখির আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালের সরকারি সুরক্ষা আদেশেও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও নৌ-চলাচলকে হাওরের পরিবেশের জন্য অন্যতম হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই আদেশে অবৈধ বালু উত্তোলন, নিষিদ্ধ চায়না জাল, জলজ বন ধ্বংস, অতিরিক্ত বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার এবং বর্জ্য নিঃসরণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এটি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। মাছ, জলজ উদ্ভিদ, কৃষি এবং হাওরকেন্দ্রিক নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবার। হাওরের পানি ও জলজ প্রতিবেশ দূষিত হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন স্থানীয় মানুষ। মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে কমে যেতে পারে মাছের উৎপাদন। জলজ উদ্ভিদ ও পাখির আবাসস্থল নষ্ট হলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলেই এর প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থাৎ, টাঙ্গুয়ার হাওরকে কেবল পর্যটনের অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা, যার সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবন সরাসরি যুক্ত।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ এলাকায় হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান প্রবেশ ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞাসহ ১১ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করে। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।

পরবর্তীতে হাওরের বিভিন্ন প্রবেশপথে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণে লাল নিশান স্থাপন এবং পর্যটক ও হাউসবোট সংশ্লিষ্টদের জন্য নির্দেশনাসংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসব উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও পরিবেশবিদদের মতে, শুধু অভিযান বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে হাওর রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নৌযান নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতির বাস্তবায়ন।

টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটন বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি পর্যটনব্যবস্থা, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে, পর্যটকরাও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন, কিন্তু হাওরের প্রতিবেশের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে না।

হাউসবোটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করা, নির্দিষ্ট এলাকায় নৌযান চলাচল সীমিত রাখা, সংবেদনশীল জলাভূমি ও পাখির আবাসস্থলে পর্যটক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ শব্দ ও জেনারেটর ব্যবহারে কঠোরতা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা এবং নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণÑএসব পদক্ষেপ কার্যকর করা জরুরি।

কারণ টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্যই যদি বাণিজ্যিক পর্যটনের চাপে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে একসময় পর্যটকরাও হারাবেন তাঁদের কাক্সিক্ষত সেই প্রকৃতি। আর তখন ক্ষতিটা শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্রের হবে না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং এর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা। টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচাতে তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑপ্রকৃতিকে ব্যবহার করে পর্যটন নয়, প্রকৃতিকে বাঁচিয়েই পর্যটন।


আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

রাষ্ট্রপ্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট আগমন উপলক্ষে মহানগর তাঁতী দলের প্রস্তুতি সভা

রাষ্ট্রপ্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট আগমন উপলক্ষে মহানগর তাঁতী দলের প্রস্তুতি সভা

রাষ্ট্রপ্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট আগমন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভার আয়োজন করেছে সিলেট মহানগর তাঁতী দল। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নগরীর

সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখার পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত

সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখার পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত

‎​‎প্রবাসে সিলেট বিভাগের মানুষের অধিকার আদায়, জনকল্যাণ এবং দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের প্রত্যয় নিয়ে ‘সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ’ যুক্তরাজ্য

সিলেট মহানগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ‘সীরাত সেমিনার’ অনুষ্ঠিত

সিলেট মহানগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ‘সীরাত সেমিনার’ অনুষ্ঠিত

রাসূল (সাঃ)-এর সুশাসন ও জীবন দর্শনই শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথ : মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সিলেট মহানগরী

‎বর্ণাঢ্য আয়োজনে এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির এক দশকে পদার্পণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন

‎বর্ণাঢ্য আয়োজনে এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির এক দশকে পদার্পণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন

‎এক দশক ধরে এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করে যাচ্ছে সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

মৌলভীবাজার সমিতি সিলেটের উদ্যোগে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনায় বক্তারা

মৌলভীবাজার সমিতি সিলেটের উদ্যোগে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনায় বক্তারা

‘সুশিক্ষা হলো মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ’ সিলেটে বসবাসরত মৌলভীবাজার জেলাবাসীদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘মৌলভীবাজার সমিতি, সিলেট’-এর ব্যবস্থাপনায় ও মৌলভীবাজার সমিতি শিক্ষা

জার্নিমেকারজবসে বিনিয়োগকারী ও পরিচালক হিসেবে যুক্ত হলেন মোয়াম্মির চৌধুরী

জার্নিমেকারজবসে বিনিয়োগকারী ও পরিচালক হিসেবে যুক্ত হলেন মোয়াম্মির চৌধুরী

জার্নিমেকারজবস (জেএমজে)-এ নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে মোয়াম্মির চৌধুরী প্রতিষ্ঠানে একজন বিনিয়োগকারী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছেন।

সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ফ্রি ডেন্টাল ক্যাম্প সুস্থ জীবনের জন্য মুখের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি: কয়েস লোদী

সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ফ্রি ডেন্টাল ক্যাম্প সুস্থ জীবনের জন্য মুখের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি: কয়েস লোদী

সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সিলেট সেন্ট্রাল ডেন্টাল কলেজের উদ্যোগে এক ফ্রি ডেন্টাল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল ১০টা থেকে

বিএনপিতে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের তোড়জোড়

বিএনপিতে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের তোড়জোড়

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ, ছাত্রদল-স্বেচ্ছাসেবক দলে নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা মো.জুনেদ আহমদ,ফ্রান্স: জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো