admin
প্রকাশিত: 7:09 AM, July 14, 2026
সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতীক হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার শরিফকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক বিশাল লুটেরা সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
বিগত সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনের একাংশের মদদ এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে বছরের পর বছর ধরে এই পবিত্র স্থানের শত শত কোটি টাকার সম্পদ ও ভক্তদের দানের টাকা হরিলুট করা হয়েছে। ৭০০ বছরের ইতিহাস ভেঙে সম্প্রতি প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের দানবাক্স ও ঐতিহাসিক ডেকগুলো প্রকাশ্যে খোলার পর সেখান থেকে পাওয়া বেশ কিছু বিশেষ চিরকুট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া নথিপত্রকে কেন্দ্র করে সিলেট জুড়ে এখন তীব্র তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মাজারের দানবাক্স খোলার পর উদ্ধার হওয়া একটি চিরকুটে এক খাদেমের সহকারী ‘খোকন’ ওরফে ‘বকরি খোকন’-এর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ ও কর্মচারীদের ওপর জুলুমের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠে এসেছে। আবু জলিল হাবিব নামের এক ভক্তের চিঠিতে বলা হয়, মাজারের দান হিসেবে আসা গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি অবৈধভাবে বেচাকেনা করে খোকন বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। প্রায় ৪০ বছর আগে কুমিল্লা থেকে শূন্য হাতে সিলেটে এসে চুরির মাধ্যমে সে আজ আলিশান বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে গেছে।
এই চিরকুটের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছেন নিজেকে ‘আশিকানে আউলিয়া’র চেয়ারম্যান দাবি করা বহুরূপী জামান। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা এই ব্যক্তি নিজেকে একেক সময় ডক্টর, উকিল, সাংবাদিক কিংবা ধর্মীয় বিভিন্ন মতবাদের অনুসারী দাবি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিলেন, যাকে ইতিপূর্বে হবিগঞ্জের একটি স্পর্শকাতর ঘটনার দায়ে নিজ এলাকা থেকে বিতাড়িতও হতে হয়েছিল।
মাজারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে একচেতিয়া আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় নাম দরগাহ গেট এলাকার কথিত চিকিৎসালয় সামুন মাহমুদ খান (মরহুম আলী মাহমুদ খানের ছেলে, মূল বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে)। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠতার দাপট দেখিয়ে সামুন মাজারের মূল কমিটি ও খাদেমদের জিম্মি করে দরগাহ গেটের দোকানপাট নামমাত্র মূল্যে দীর্ঘমেয়াদি লিজ লিখে নিয়েছিলেন, যার ভাড়া মাজার তহবিলে জমা না হয়ে সরাসরি সামুনের পকেটে যেত।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছর মাজারের সিন্দুকে দেশ-বিদেশের যে কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা আসত, তা গণনার সময় প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে সামুন সিন্ডিকেটের লোকজন উপস্থিত থাকত এবং ব্যাংক ব্যাংকিংয়ের আগেই একটি বিশাল অংশ পেছনের দরজা দিয়ে বস্তাবন্দী করে সরিয়ে ফেলা হতো। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সামুনসহ সিন্ডিকেটের মূল হোতারা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের গোপন চ্যাট স্ক্রিনশট, ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার জমির আমমোক্তারনামা দলিল এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি ফাঁস হয়।
এদিকে খালিদ মাহমুদের নেতৃত্বে শাহপরান মাজারে ২১ খাদেমের ২০০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য, অনুদান ও অর্থ আত্মসাতের মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত একটি সুনির্দিষ্ট দুই চকের ২১ জন খাদেমের বিরুদ্ধে মাজারের টাকা লুটে কোটিপতি হওয়ার এবং দেশ-বিদেশে অবৈধ সম্পত্তি গড়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সাবেক মুজাহিদ হারুনুর রশদের ছেলে মামুনুর রশিদ কৌমেল মাজারের প্রধান খাদিম হয়ে বসার পর থেকেই লুটপাটের রাজত্ব শুরু হয়।
এই মামুনুর রশিদ এখন খাদিমপাড়া ইউনিয়নে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্পত্তি, নোয়াগাঁও এলাকায় ৩০০ একর জমি, মৌলভীবাজার ও সিলেটে একাধিক ক্লিনিক (সেন্ট্রাল ক্লিনিকসহ) এবং নগরীর নামী বিপণিবিতান শোরিয়া, আলহামরা, করিম উল্লাহ ও ব্লু-ওয়াটারে একাধিক দোকানের মালিক। এছাড়া শাহজালাল উপশহরের বি ব্লকে বিলাসবহুল বাড়ি, ঢাকায় উত্তরায় ফ্ল্যাট এবং ব্রিটেনের ওয়াইটন সিটিতেও তিনি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুদক ও ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের মামলা রয়েছে। এই চক্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও সুবিধাবাদী সদস্যরা হলেন তাঁর ভাই আমিনুর রশিদ, ভাইপো ও সাবেক কমিশনার কামাল আহমদ, চাতাতো ভাই আজিজুর রহমান কুপ্র এবং ভাতিজা ফিরোজ মিয়া।
এছাড়াও মাজারের টাকা লুটের এই সিন্ডিকেটে সরাসরি যুক্ত আছেন হাবিবুর রহমান, কবির আহমদ, ফখরুল গাজী, ফজলুর রহমানসহ আরও ২১ জনের নাম এসেছে।
ওয়াকফ প্রশাসন মাজারের নয়ছয়ের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের বিরুদ্ধে ১১ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে এই কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করলেও, স্থানীয় ওয়াকফ কর্মকর্তাদের নিয়মিত মোটা অঙ্কের বখরা দিয়ে এই চক্রটি আধিনায়কে বৈধতা দিয়ে আসছিল। বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর পক্ষে মো. বদরুল ইসলাম উচ্চ আদালতে মোতাওয়াল্লী অপসারণ ও অবৈধ কমিটির বিরুদ্ধে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন।
ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের কল্যাণের জন্য প্রথমে ৭৮.২ একর ফরমুদান বা করমুক্ত জমি দান করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন সংযুক্তি মিলিয়ে মোট ১১৬.৪ একরে দাঁড়ায়। কিন্তু জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঐতিহাসিক ভূমির সিংহভাগই জবরদখল করে নিয়েছে। বর্তমানে মাজার কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে মাত্র কয়েক একর জমি অবশিষ্ট রয়েছে এবং বাকি প্রায় ৮০ থেকে ৯০ একরেরও বেশি মূল ওয়াকফ ভূমি বিভিন্ন কৌশলে হাতছাড়া হয়ে গেছে।
একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারেও, যেখানে মূল ৪০ থেকে ৫০ একর জমির প্রায় ৭০% জমিই বেদখল হয়ে গেছে। সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক সংলগ্ন মাজারের প্রধান প্রবেশপথের চারপাশের বাণিজ্যিক দোকানপাট, হোটেল, মার্কেট ও পেছনের নিচু ভূমি অবৈধভাবে দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলার কারণে বর্তমানে সেখানে মাজারের নিয়ন্ত্রণে মাত্র ১০ থেকে ১২ একরের মতো ভূমি অবশিষ্ট রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের দানবাক্স ও বিভিন্ন খাত থেকে লুণ্ঠিত অর্থ কেবল অভিযুক্তদের নামেই রাখা হয়নি। ধরা পড়ার ভয়ে সিন্ডিকেটের মূল হোতারা তাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও নিকটাত্মীয়দের নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ টাকা জমা ও পাচার করেছে। সিলেটবাসীর স্পষ্ট দাবি, কেবল মূল অপরাধীদের হিসাব তলব করলেই হবে না, বরং তাদের পুরো পরিবারের ব্যাংক লেনদেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে অ্যাকাউন্টগুলো অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা প্রয়োজন।
সিলেটের সুশীল সমাজ ও ছাত্র-জনতা মনে করছেন, এটি কেবল সাধারণ কোনো চুরি নয়, এটি একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ ও মানি লন্ডারিং। তাই এই সিন্ডিকেটের অবৈধ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সরাসরি সম্পৃক্ত করার দাবি উঠেছে। দুদকের মাধ্যমে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে লুণ্ঠিত অর্থের উৎস এবং তা কোথায় কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ও সিলেট উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী জানিয়েছেন, বর্তমানে যেভাবে দানের টাকা গণনা করে জেলা প্রশাসকের অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হচ্ছে, তা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাজার, দরগাহ মসজিদ ও মাদরাসার উন্নয়ন এবং সুষম বণ্টনের জন্য একটি চমৎকার রূপরেখা ও স্থায়ী সমাধান তৈরি করতে আগামী বৃহস্পতিবার ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি পুনরায় বৈঠকে বসবে। এই কমিটির প্রধান, বরিষ্টমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুজাহিদের নেতৃত্বে এক মাসের মধ্যে একটি চূড়ান্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক নীতিমালা তৈরি করা হবে।
সিলেটের সর্বস্তরের সচেতন মহল ও ভক্তকুলের দাবি, মামুনুর রশিদ, সামুন মাহমুদ খান কিংবা বকরি খোকনদের মতো “মাজারখেকো” লুটেরাদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করে তা রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নেওয়া হোক। একই সাথে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ওয়াকফ প্রশাসন যৌথভাবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে আদি সীমানা সিএস ও আরএস রেকর্ড খতিয়ে দেখুক, তবেই বেদখল হওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
মামলায় আসামির পরও বহাল তবিয়তে গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলার মামলায় আসামি হওয়া সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের
বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক মন্দা, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এবং তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা ব্যতীত সিলেটে যেকোনো
স্মারকলিপি প্রদান ও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট (লোডশেডিং) ও ব্যবসায়িক মন্দার মধ্যে সিলেটে সৃজনশীল পণ্য
সিলেটের পাথর ও বালুবহুল সীমান্তাঞ্চল জাফলংয়ের পাথর কোয়ারি থেকে তামাবিল স্থলবন্দর ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সীমান্তপথ দিয়ে চোরাই পথে ভারতীয় পণ্য প্রবেশকে কেন্দ্র করে ‘লাইনম্যান’ খ্যাত শ্যাম কালার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট সফর উপলক্ষে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে ঘিরে সিলেটে বিএনপির
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও তথ্য পাচারের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ নগরবাসী সরকারি কর্মকাণে খরচ কমানো ও কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর নির্দেশনা চললেও সিলেট সিটি করপোরেশনে
সিলেট সদর উপজেলা রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিঃ নং-সিলেট ৮১ এর প্রথম পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাদ আসর