আম্বরখানা সুরমা সুপার মার্কেটে দালালদের রাজত্ব
অতিষ্ঠ প্রবাসী ও বিদেশি শিক্ষার্থীরা, জিম্মি পর্যটকরাও
- সিলেটের বৈশ্বিক সুনাম রক্ষার্থে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও টাস্কফোর্স গঠন।
- ২০-৩০ জনের সক্রিয় দালাল চক্রের হাতে জিম্মি পুরো এলাকা
- প্রবাসী, পর্যটক এবং সিলেটে অধ্যয়নরত প্রায় ৪ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী।
- ডলারের ভুল রেট দিয়ে প্রতারণা, পথচারীদের হেনস্থা ও নারী পর্যটকদের ইভটিজিং।
স্টাফ রিপোর্টার:
প্রবাসী অধ্যুষিত বৃহত্তর সিলেটের একমাত্র বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের প্রধান কেন্দ্রস্থল আম্বরখানা সুরমা সুপার মার্কেট এখন সাধারণ মানুষ, রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই মার্কেটে ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসলেও, সম্প্রতি এখানে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশের নানা খাতে সংস্কার ও সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হলেও, এই মার্কেটের দালাল চক্রের খুঁটির জোর অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ২০-৩০ জনের একটি সক্রিয় দালাল চক্র মার্কেটের প্রধান ফটক ও আশপাশে অবস্থান নিয়ে পুরো এলাকা জিম্মি করে রাখছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) সহ সিলেটের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নেপালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। নিজস্ব মুদ্রা বা ডলার বিনিময়ের জন্য তারা যখনই এই মার্কেটে আসেন, তখনই ওত পেতে থাকা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়েন।
সম্প্রতি নেপালের এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানান, তাকে ডলারের ভালো রেট দেওয়ার কথা বলে মার্কেটের ভেতরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে নির্ধারিত হারের চেয়ে অনেক কম টাকা দিয়ে দালাল চক্রের সদস্যরা কৌশলে চম্পট দেয়।
শুধু বিদেশি শিক্ষার্থীই নন, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত ও সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে আসা বিদেশি পর্যটকরাও এখানে এসে চরম বিব্রতকর ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দালালরা পর্যটকদের লক্ষ্য করে ‘ভাঙাইতানি, ভাঙাইতানি’ বলে চিৎকার করতে থাকে। অনেক সময় ভাষা বুঝতে না পেরে সাধারণ পথচারী ও পর্যটকরা বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হলে দালালদের হাতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হয়। এমনকি নারী পর্যটকরাও অনেক সময় ইভটিজিংয়ের শিকার হন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৭ মার্চ সোহাগ মিয়া নামের এক ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, মার্কেটের সামনে দালালরা তাকে ডলারের এক রেটের লোভ দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। কিন্তু টাকা পেমেন্ট করার সময় সম্পূর্ণ কম রেট দিয়ে তাকে বিদায় করে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হয়নি, উল্টো হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো প্রবাসী রেমিট্যান্সের টাকা বিনিময় করতে কিংবা কেউ বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পাসপোর্টে ডলার এনডোর্স করতে মার্কেটের সামনে আসামাত্রই দালালরা তাকে জোরপূর্বক ছেঁকে ধরে। এরপর নিজেদের ইচ্ছেমতো কম রেট দিয়ে কাস্টমার বিদায় করা হয়। কেউ এর প্রতিবাদ করলে জোটে তিরস্কার ও শারীরিক-মানসিক লাঞ্ছনা।
সচেতন মহলের মতে, সিলেটের আধ্যাত্মিক ও পর্যটন নগরী হিসেবে যে বৈশ্বিক সুনাম রয়েছে, তা গুটিকয়েক দালালের জন্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল মনে করেন, অবিলম্বে এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় প্রবাসীদের আস্থা হারানোর পাশাপাশি সিলেটের পর্যটন ও শিক্ষাঙ্গনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকলেও এই বিশাল দালাল চক্র তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুরমা সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ছাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, “গ্রাহক হয়রানি বন্ধের বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে প্রশাসনকে অবহিত করেছি। সকল ব্যবসায়ী ও প্রশাসন মিলে আমরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই হয়রানি বন্ধে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করব।”
মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমদ (গেদা) বলেন, “মার্কেটের সামনে যারা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে, তারা আমাদের মার্কেটের কোনো ব্যবসায়ী বা স্টাফ নন। এরা মূলত ভাসমান অপরাধী চক্র, যারা বাইরে থেকে এসে মার্কেটের পরিবেশ নষ্ট করছে।”