সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেই চরম নিরাপত্তাহীনতায় গৃহকর্মী শিরিন
- মামলা প্রত্যাহারে প্রাণনাশ ও অপহরণের হুমকির অভিযোগ, তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
আহমেদ শাকিল:
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় এক গৃহকর্মীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক বক্তব্য আদায়, তা ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার বাদী শিরিন বেগম এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিদের অব্যাহত হুমকি, মামলা প্রত্যাহারের চাপ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।উপায়ান্তর না পেয়ে ভুক্তভোগী শিরিন বেগম সম্প্রতি সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির নিকট লিখিত আবেদন করেছেন। গত ১৭ জুন দেওয়া ওই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, আসামিরা সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তাকে যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। তাদের ব্যবহৃত ফেসবুক আইডি থেকে তার ছবি ও ভিডিও পোস্ট, শেয়ার এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে তাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়।
এ ঘটনায় শিরিন বেগম সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ২২, ২৩ ও ২৫ ধারায় সিলেট সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর সাইবার পিটিশন-১৯৭/২০২৫। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে বড়লেখা থানা মামলাটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করে। থানার মামলা নম্বর ০৪, তারিখ ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং জিআর মামলা নম্বর ২০৯/২০২৫। আবেদনে শিরিন বেগম অভিযোগ করেন, মামলা দায়েরের পর থেকেই প্রভাবশালী আসামিরা তাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছে। তারা প্রকাশ্যে তাকে বলে, “তুমি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে বড় ভুল করেছ। আমরা যখন চাইব তখনই জামিন নিয়ে বের হয়ে আসব। আমাদের গ্রেফতার করার মতো কেউ নেই। থানা-পুলিশ সব আমাদের নিয়ন্ত্রণে।”তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত ১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে কয়েকজন আসামি তার বাড়িতে গিয়ে মামলা প্রত্যাহার না করলে তাকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলার হুমকি দেয়। বিষয়টি তিনি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই মৌলভীবাজারের এসআই বিকাশ চন্দ্র দাসকে অবহিত করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন।শিরিন বেগমের অভিযোগ, পরবর্তীতে বড়লেখা থানায় যোগাযোগ করলে পুলিশ জানায়, মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের ওপর ন্যস্ত থাকায় আসামিদের গ্রেফতারের এখতিয়ার তাদের নেই। এদিকে তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশেরও অভিযোগ তুলেছেন।
মামলার আসামিরা হলেন, বড়লেখা উপজেলার কেছরিগুল গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে হাসান আহমদ (৩২), মোহাম্মদনগর গ্রামের মৃত জমির উদ্দিনের ছেলে নাজিম উদ্দিন (৩৮), ছোটলেখা চা বাগানের সমছু মিয়ার ছেলে জুলহাস আহমদ (৩২), মোহাম্মদনগর গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর ছেলে সুনাম উদ্দিন (৪০), একই গ্রামের মৃত মছদ্দর আলীর ছেলে আবু সালমা (৩২), আব্দুল মালিকের ছেলে সাদিকুর রহমান (৩০) এবং পাখিয়ালা গ্রামের মঈন উদ্দিনের ছেলে সিপার (২৮)।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড়লেখার এক ইউপি চেয়ারম্যানকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে একটি পক্ষ নিরীহ গৃহকর্মী শিরিন বেগমকে ব্যবহার করেছে। শিরিন বেগম জানান, তিনি বড়লেখা উপজেলার ৫ নম্বর শাহবাজপুর ইউনিয়নের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মন্নান মনার ভাইয়ের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। একদিন তিনি তার শিশু সন্তান নিহাদকে নিয়ে ওই বাসায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় বাসায় অন্য কেউ ছিল না।হঠাৎ দুজন ব্যক্তি নিজেদের বাড়ির মালিকপক্ষের লোক পরিচয় দিয়ে দরজা খুলতে বলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ১০-১২ জনের একটি দল ঘরে প্রবেশ করে। তারা সন্ত্রাসী কায়দায় তাকে মারধর করে এবং আব্দুল মন্নান মনার অবস্থান জানতে চায়।একপর্যায়ে সাদিকুর রহমান নামের একজন তার গলায় ছুরি ধরে এবং মনা মেম্বারের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে— এমন বক্তব্য দিতে চাপ প্রয়োগ করে। তিনি রাজি না হলে তার শিশু সন্তান নিহাদকে কেড়ে নিয়ে গলা চেপে ধরে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সন্তানের জীবন রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে তিনি তাদের কথামতো বক্তব্য দেন এবং সাদিকুর রহমান মোবাইল ফোনে তা ভিডিও ধারণ করেন।পরবর্তীতে গত অক্টোবর মাসে দুটি ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর স্বামী কমর উদ্দিন যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করেন শিরিন। বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে অবস্থান করলেও আসামিদের অব্যাহত হুমকির কারণে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মন্নান মনা বলেন, “আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ একটি নিরীহ নারীর সংসারও ধ্বংস করে দিয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই মৌলভীবাজারের এসআই বিকাশ চন্দ্র দাস বলেন, “মামলাটি জটিল প্রকৃতির হওয়ায় তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কিছুটা সময় লাগছে।” আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি বড়লেখায় গেলে তাদের খুঁজে পাই না।” তবে আসামিরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে— এমন অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।এদিকে মামলার বাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন— আদালতের নির্দেশে দায়ের হওয়া মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও কেন এখনো তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না, এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?