admin

প্রকাশিত: ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৭, ২০২৬

পাথরখেকোদের গ্রাসে বিলীন হচ্ছে ৫০০ বছরের ‘জাফলং রাজবাড়ী’

পাথরখেকোদের গ্রাসে বিলীন হচ্ছে ৫০০ বছরের ‘জাফলং রাজবাড়ী’

জাহিদুল ইসলাম:

সিলেটের জাফলং বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল আর পাহাড়ের মিতালি। কিন্তু সেই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আড়ালে আজ লুকিয়ে আছে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। প্রকৃতির রূপের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচশ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী ‘জাফলং রাজবাড়ী’ এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। পাথরখেকোদের করাল গ্রাস এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় ইতিহাসের বুক চিরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শেকড়। জাফলং নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর শুধু পাথরের ঠুনঠুন শব্দ শোনা যায় না, শোনা যায় ধসে পড়া প্রাচীন ইটের নীরব ক্রন্দন।

ইতিহাসের ধূলিমাখা পাতা উল্টলে দেখা যায়, বর্তমানের এই অবহেলিত জাফলং একসময় ছিল একটি স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের রাজধানী। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে জৈন্তিয়া সাম্রাজ্য একীভূত হওয়ার আগে জাফলং ছিল অন্যতম শক্তিশালী খণ্ডরাজ্য। পরবর্তীতে রাজধানী নিজপাটে স্থানান্তরিত হলেও জৈন্তিয়ার রাজারা এই রাজবাড়ীটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। আবার অনেক ইতিহাসবিদের দাবি, ১৩০০ সালেরও আগে এখানে ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের প্রতাপ ছিল। নিয়াং ও মাইলং রাজাদের সেই রাজকীয় আভিজাত্যের শেষ চিহ্ন হিসেবে রাজবাড়ীটি শত শত বছর ধরে টিকে ছিল।

১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থাপনার অবক্ষয় শুরু হয়। দীর্ঘ ১১২ বছরের শাসনামলে ব্রিটিশরা এখান থেকে বিপুল সম্পদ আহরণ করলেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই অবহেলার ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি ‘সিলেট ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ ট্রাস্টি’-র একটি প্রতিনিধি দল রাজবাড়ীটি পরিদর্শনে গিয়ে ভয়াবহ চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন ট্রাস্টের সভাপতি ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, গবেষক আসিফ আযহার এবং সাংবাদিক আব্দুর রহমান হীরা।

পরিদর্শন শেষে গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহার বলেন, “গত সপ্তাহে আমরা জাফলং রাজবাড়ী পরিদর্শনে গিয়ে যা দেখেছি তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। পাথরখেকোদের সীমাহীন লোভ আর তাণ্ডবে রাজধানীর মূল অংশ ইতিমধ্যে নদীগর্ভে সমাধি নিয়েছে। এমনকি প্রাচীন মাইলং রাজার বাড়িটিও ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে। এটি শুধু একটি স্থাপনার ধ্বংস নয়, বরং আমাদের পাঁচশ বছরের ইতিহাসের সলিল সমাধি।”

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ীর পশ্চিম ও উত্তর দিকের দেওয়ালগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন। দক্ষিণের প্রধান ফটকটি জরাজীর্ণ অবস্থায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, যেন শেষ বিদায়ের অপেক্ষায়। অবাধ পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে মাটির গভীর থেকে ভিত্তি সরে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতি বর্ষায় স্থাপনার অবশিষ্ট অংশগুলো আলগা হয়ে নদীতে ধসে পড়ছে। মূলত কৃত্রিম নদীভাঙন এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কণ্ঠে আজ কেবলই হতাশা আর বেদনা। এক প্রবীণ বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “এই রাজবাড়ীর ইটে আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস লেগে আছে। আজ টাকার লোভে কিছু মানুষ সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা চোখের সামনে আমাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছি, কিন্তু পাথরখেকোদের প্রভাবের কারণে আমরা অসহায়।”

পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, জাফলং এলাকায় যেভাবে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন চলছে, তা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের সামিল। অনেকেই একে সরাসরি “ঐতিহ্যিক হত্যাকাণ্ড” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি এখন জোরালো। স্থানীয় সচেতন মহল ও ইতিহাস অনুরাগীরা অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজবাড়ী এলাকাকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা। নির্ধারিত সীমানার মধ্যে সব ধরনের পাথর ও বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। নদীভাঙন রোধে টেকসই সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ। অবশিষ্টাংশ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার ও সংরক্ষণ। এটি আমাদের ইতিহাস ও অস্তিত্বের প্রতীক। এখনই প্রশাসনের দৃঢ় ও আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন, নয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের এই পাঁচশ বছরের গৌরবের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে না।


সর্বশেষ সংবাদ

জাতীয় পুরস্কার অর্জন করায় আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলকে সংবর্ধনা

জাতীয় পুরস্কার অর্জন করায় আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলকে সংবর্ধনা

সিলেটের সংবাদ ডেস্ক: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে সিলেট আর্ট এন্ড

নগর ভবনে প্রস্তুতি সভায় সিসিক প্রশাসক

নগর ভবনে প্রস্তুতি সভায় সিসিক প্রশাসক

৮ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করতে হবে সিলেটের সংবাদ ডেস্ক: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন,

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এ গোল্ড মেডেল পেল মারিয়া মেহজাবিন মাওয়া

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এ গোল্ড মেডেল পেল মারিয়া মেহজাবিন মাওয়া

‎‎সিলেট সিটি করপোরেশনের চৌকিদেখী এলাকার শাহপরান প্রি-ক্যাডেট একাডেমির শিক্ষার্থী মারিয়া মেহজাবিন মাওয়া “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬” প্রতিযোগিতার উশু ইভেন্টে গোল্ড মেডেল

টেন্ডার ছাড়াই পিয়াইন নদীতে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি

টেন্ডার ছাড়াই পিয়াইন নদীতে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি

ড্রেজারে বালু কাটছে আলীম সিন্ডিকেট স্টাফ রিপোর্টার: সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে, কোনো প্রকার টেন্ডার বা ইজারা ছাড়াই সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার

সুরমা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে মসজিদ স্কুল কবরস্থান ও বাজার

সুরমা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে মসজিদ স্কুল কবরস্থান ও বাজার

সাকির আমিন, ছাতক: সুনামগঞ্জের ছাতক সদর ইউনিয়নের আন্ধারী গাঁও,মল্লিক পুর,কেশব পুর ও বাউশা ডহর (গভীর) নামক স্থানে সুরমা নদীর ভাঙনে

সিলেট সদর উপজেলার পুটিকাটা বিল জলমহালের ইজারা পেয়েছে চাতল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড

সিলেট সদর উপজেলার পুটিকাটা বিল জলমহালের ইজারা পেয়েছে চাতল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড

সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার ইউনিয়নাধীন পুটিকাটা বিল জলমহাল ১৪৩৩-১৪৩৫ বাংলা সনের চৈত্র পর্যন্ত সময়ের জন্য বার্ষিক ৩,০৮,২২৪ (তিন লক্ষ আট

সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের লিফলেট বিতরণ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি অক্ষরে অক্ষরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: অ্যাড. মোমিনুল ইসলাম মোমিন

সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের লিফলেট বিতরণ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি অক্ষরে অক্ষরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: অ্যাড. মোমিনুল ইসলাম মোমিন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সবসময়ই জনগণের আকাঙক্ষা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত

জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতে উন্নয়ন বরাদ্দের ৪০ ভাগ বরাদ্দের দাবিতে অর্থমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি

জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতে উন্নয়ন বরাদ্দের ৪০ ভাগ বরাদ্দের দাবিতে অর্থমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি

জাতীয় বাজেটে উন্নয়ন বরাদ্দের ৪০ভাগ কৃষি খাতে বরাদ্দ ও হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ ১০দফা দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক