admin

প্রকাশিত: 8:00 AM, September 19, 2026

নেশা ও জুয়ার ফাঁদে তারুণ্য আইন, অভিযান ও সামাজিক প্রতিরোধÑকোন পথে সমাধান অ্যাডভোকেট আব্দুল কাইয়ুম

নেশা ও জুয়ার ফাঁদে তারুণ্য আইন, অভিযান ও সামাজিক প্রতিরোধÑকোন পথে সমাধান অ্যাডভোকেট আব্দুল কাইয়ুম

একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের মেধা, শ্রম, সাহস ও সৃজনশীলতাই একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই তরুণ সমাজ যখন মাদক, জুয়া, অনলাইন বেটিং ও নানা ধরনের অপরাধের ফাঁদে আটকে পড়ে, তখন এটি আর ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না; পরিণত হয় জাতীয় ও সামাজিক সংকটে।

বর্তমান সময়ে মাদক ও জুয়ার বিস্তার নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একদিকে মাদকের সহজলভ্যতা তরুণদের একটি অংশকে নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে অনলাইন জুয়া ও বেটিং পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের হাতের মুঠোয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়Ñএই ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ।

মাদকাসক্তি একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি তার পরিবারকেও বিপর্যস্ত করে। একজন তরুণ মাদকে আসক্ত হলে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার শিক্ষা, কর্মজীবন ও পারিবারিক সম্পর্ক। ধীরে ধীরে অর্থের প্রয়োজন বাড়তে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে সে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

তাই মাদককে কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা।

প্রশ্ন হলোÑআমরা কি শুধু মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করেই সন্তুষ্ট থাকব? নাকি মাদকের সরবরাহব্যবস্থার মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনব?

কারণ, একটি চক্রের একজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করলেই যদি তার জায়গায় আরেকজন চলে আসে, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের প্রবাহ এবং এর পেছনে থাকা সংঘবদ্ধ চক্রকে চিহ্নিত করা জরুরি।

একসময় জুয়া নির্দিষ্ট জায়গা বা আসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন প্রযুক্তির কারণে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়া সম্ভব।

অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলোÑএটি চোখের সামনে দৃশ্যমান নয়। একজন তরুণ নিজের ঘরে বসেই এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। শুরুতে সামান্য অর্থ দিয়ে খেলা, তারপর হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগÑএভাবেই তৈরি হয় আসক্তির ভয়ংকর চক্র।

অনেক তরুণ দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্নে জুয়ার ফাঁদে পা দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জুয়া কখনো স্থায়ী আয়ের পথ হতে পারে না। বরং এটি মানুষকে ঋণগ্রস্ততা, হতাশা, পারিবারিক অশান্তি এবং কখনো কখনো অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।

মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং প্রচলিত আইনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু একটি বিষয় আমাদের স্বীকার করতেই হবেÑশুধু অভিযান চালিয়ে মাদক ও জুয়ার মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। অপরাধ দমন করতে হবে, একই সঙ্গে অপরাধের সামাজিক কারণও দূর করতে হবে। একজন তরুণ কেন মাদকে যাচ্ছে? কেন সে অনলাইন জুয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে? কেন সে সহজে অর্থ উপার্জনের স্বপ্নে নিজের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে?

বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক নজরদারির অভাব, খারাপ সঙ্গ, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতাÑএসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে পরিবার থেকেই। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেÑঅভিভাবকদের এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

তবে শুধু পরিবার নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় কমিউনিটিকেও দায়িত্ব নিতে হবে।

তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। কারণ একটি তরুণের সামনে যখন ইতিবাচক পথ খোলা থাকে, তখন অপরাধের অন্ধকারে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।

একটি সমাজে যারা নেতৃত্ব দেন, তাদের অবস্থান হতে হবে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও আপসহীন। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, আইনজীবী এবং সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দÑসবার সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক, মাদক ব্যবসা বা জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে তার পরিচয় যেন আইনের প্রয়োগে বাধা না হয়। আইনের শাসনের মূল কথা হলোÑআইনের চোখে সবাই সমান।

মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবেÑমাদকের মূল উৎস ও হোতাদের শনাক্ত করা, অর্থের প্রবাহ অনুসন্ধান করা, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি, আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক সচেতনতা জোরদার করা।

একই সঙ্গে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ শুধু শাস্তি দিয়ে একটি মানুষকে পরিবর্তন করা যায় না; প্রয়োজন হলে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও করতে হবে।

মাদক, ক্যাসিনো ও অনলাইন জুয়াÑএগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোর সঙ্গে পরিবার, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, যুবসমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত।

আজকের একজন মাদকাসক্ত বা জুয়ায় আসক্ত তরুণ শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে না; তার মাধ্যমে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাই এখন প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ, পারিবারিক সচেতনতা এবং তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প তৈরি করা। মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের নয়Ñএটি আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ একটি

প্রজন্মকে রক্ষা করা মানে শুধু কয়েকজন তরুণকে রক্ষা করা নয়; রক্ষা করা একটি জাতির ভবিষ্যৎকে।

লেখক: অ্যাডভোকেট আব্দুল কাইয়ুম, জজ কোর্ট, সিলেট ও সুনামগঞ্জ।


সর্বশেষ সংবাদ

জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে মিফতাহ্ সিদ্দিকীর শোক

জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে মিফতাহ্ সিদ্দিকীর শোক

সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন

মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে খন্দকার মুক্তাদিরের শোক

মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে খন্দকার মুক্তাদিরের শোক

সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন মজুমদার ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি

জাকির মজুমদারের ইন্তেকালে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর শোক

জাকির মজুমদারের ইন্তেকালে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর শোক

সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন মজুমদারের অকাল ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ

জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের শোক

জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের শোক

সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন মজুমদারের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির

জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে মহানগর বিএনপি নেতা

জাকির মজুমদারের মৃত্যুতে মহানগর বিএনপি নেতা

সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন মজুমদার আর নেই। গতকাল রাত ১২টার দিকে তিনি

সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে শেষ ‘ইউথ লিডারশিপ ট্রেনিং’ সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে তরুণ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই

সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে শেষ ‘ইউথ লিডারশিপ ট্রেনিং’ সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে তরুণ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই

একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে তরুণদের গঠনমূলক নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। তাই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তরুণদেরই সম্প্রীতির

কৃষ্ণপুর গণহত্যা ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বও লাখাইয়ে পাক বাহিনীর বর্বরোচিত তাণ্ডব

কৃষ্ণপুর গণহত্যা ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বও লাখাইয়ে পাক বাহিনীর বর্বরোচিত তাণ্ডব

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলবেষ্টিত লাখাই উপজেলার ১নং ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে পালিত হয়েছে ঐতিহাসিক গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরÑআজকের এই

অনলাইন জুয়াড়িসহ ৬ জন গ্রেপ্তার, এয়ারগান ও গাঁজা উদ্ধার

অনলাইন জুয়াড়িসহ ৬ জন গ্রেপ্তার, এয়ারগান ও গাঁজা উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট বিভাগে পৃথক তিনটি অভিযান চালিয়ে এয়ারগান, বিপুল পরিমাণ গাঁজা এবং স্মার্টফোনসহ অনলাইন জুয়া চক্রের চার সদস্য ও